সফরের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে ‘অভিন্ন ভবিষ্যতের সম্প্রদায়’ গঠনের সিদ্ধান্ত এবং কৌশলগত সহযোগিতাকে আরও গভীর করার রাজনৈতিক অঙ্গীকারকে।
সম্পর্কের নতুন রাজনৈতিক ভিত্তি
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যৌথভাবে দুই দেশের মধ্যে ‘নতুন যুগে অভিন্ন ভবিষ্যতের বাংলাদেশ-চীন সম্প্রদায়’ গঠনের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছেন।
এর ফলে বিদ্যমান কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারিত্ব আরও উচ্চতর পর্যায়ে উন্নীত হলো। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু প্রতীকী ঘোষণা নয়, বরং আগামী বছরগুলোতে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতার রূপরেখা নির্ধারণ করবে।
১৫ দফার যৌথ ইশতেহার
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের সময় বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ১৫ দফার যৌথ ইশতেহার ঘোষণা করা হয়েছে। এই ঘোষণার পাশাপাশি অবকাঠামো, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নসহ বিভিন্ন খাতে একাধিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর হয়েছে।
তিস্তা প্রকল্পে চীনের সহায়তার প্রতিশ্রুতি
বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অগ্রাধিকার প্রকল্প তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে (টিআরসিএমআরপি) চীন সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তিস্তা ইস্যুতে এটি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কারণ, উত্তরাঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি ও পরিবেশগত ভারসাম্যের সঙ্গে প্রকল্পটি সরাসরি যুক্ত। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে উত্তরবঙ্গে শুষ্ক মৌসুমে পানি সমস্যার সমাধান হবে।
বাংলাদেশ চীনের প্রস্তাবিত গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভে (জিডিআই) যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০১৬ সালে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে (বিআরআই) যোগ দেওয়ার পর এটিই চীনের আরেকটি বড় বৈশ্বিক উদ্যোগে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা। এর ফলে উন্নয়ন অর্থায়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে নতুন সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীন সফরে চীনা প্রেসিডেন্টের চারটি বৈশ্বিক উদ্যোগকে সমর্থন জানিয়েছেন।
দুই দেশ কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে ‘টু প্লাস টু’ সংলাপ চালুর সম্ভাবনা যাচাই করতে সম্মত হয়েছে। একইসঙ্গে সামরিক প্রশিক্ষণ, উচ্চপর্যায়ের সফর এবং অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা গভীর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এটি দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
চীন বাংলাদেশের সঙ্গে সবুজ উন্নয়ন, ডিজিটাল অর্থনীতি, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং নিম্ন-কার্বন উন্নয়ন খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছে। চীনের শীর্ষ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
ভূরাজনৈতিক বার্তা কী?
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকার গঠনের পর প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়ার পরেই চীনকে বেছে নেওয়ায় একটি স্পষ্ট কূটনৈতিক বার্তা দেওয়া হয়েছে– বাংলাদেশ বহুমুখী ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করবে। একইসঙ্গে ঢাকা বেইজিংকে জানিয়ে দিয়েছে যে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অবকাঠামো সহযোগিতায় চীন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অংশীদার হিসেবেই থাকবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর থেকে বাংলাদেশ তাৎক্ষণিকভাবে বড় কোনো ঋণ বা প্রকল্প ঘোষণা না পেলেও রাজনৈতিক আস্থা, কৌশলগত সহযোগিতা, তিস্তা প্রকল্পে সমর্থন, নতুন উন্নয়ন উদ্যোগে অংশগ্রহণ এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ ও সংযোগের সম্ভাবনার মতো বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন পেয়েছে। কূটনৈতিক মহলের মতে, এই সফরের প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে আগামী মাসগুলোতে স্বাক্ষরিত সমঝোতাগুলোর বাস্তবায়নের ওপর।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর নিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্কে বিশেষ গতি পাবে। তারেক রহমানের চীন সফর গভীরতর দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশকে উন্নয়নের ধারায় ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
চীনে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমদ বলেন, চীন আমাদের অন্যতম উন্নয়ন অংশীদার। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় যাবে, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বাড়বে। এর ফলে দুই দেশই লাভবান হবে বলে প্রত্যাশা করেন তিনি।
উল্লেখ্য, গত ২১ জুন প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে মালয়েশিয়া সফর করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এরপর গত ২২ জুন চীন সফরে যান প্রধানমন্ত্রী। চার দিন সফর শেষে শুক্রবার (২৬ জুন) চীন থেকে দেশে ফেরেন তারেক রহমান।



